• শনিবার ১৫ জুন ২০২৪ ||

  • আষাঢ় ১ ১৪৩১

  • || ০৭ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৫

জামায়াত: মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী একটি দল

– কুড়িগ্রাম বার্তা নিউজ ডেস্ক –

প্রকাশিত: ২৬ ডিসেম্বর ২০২৩  

ফারাজী আজমল হোসেন

দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে এই দেশের অসংখ্য ঘটনার সাক্ষী আমি। রাজনৈতিক উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বপ্নের মৃত্যুর ভয়, সেখান থেকে আবারও স্বপ্নে সোনার বাংলা গড়ে ওঠা। সাধারণ মানুষের তীব্র প্রতিবাদী ভাষা থেকে শুরু করে নিশ্চুপ প্রতিবাদ সবই দেখা হয়েছে প্রায় পাঁচ দশকের সাংবাদিকতা জীবনে। আর এই সময়ে বাংলাদেশের ভিত্তি, সার্বভৌমত্ব এবং চেতনা পরিপন্থি সবচাইতে বড় একটি শক্তি হিসেবে বরাবরই সামনে এসে দাঁড়িয়েছে জামায়াতে ইসলামী। বর্তমানে ‘জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ’ নামে পরিচিত হলেও এই দলটির জন্ম পাকিস্তানে। কিন্তু জন্মভূমিতেও দলটি অবৈধ সন্তান হিসেবেই রয়েছে।

পাকিস্তানে ১৯৪১ সালে সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদুদীর হাত ধরে জন্ম নেওয়া এই দলটি নিয়ে শেষ জীবনে নিজেই ভয়ে দিন কাটিয়েছেন। তার নিজের সন্তানদের কাউকে তিনি এই দলের সঙ্গে যুক্ত হতে দেননি কখনও। এ বিষয়ে ‘জিহাদ উইদাউট বর্ডার’ তথ্যচিত্রে একটি সাক্ষাৎকার দেন আবুল আলা মওদুদীর ছেলে সৈয়দ হায়দার ফারুক মওদুদী। ওই সাক্ষাৎকারে ধর্মীয় রাজনীতির নামে জামায়াতের ভণ্ডামির নানা ঘটনা তুলে ধরেন মওদুদীপুত্র। নিজেদের ইসলামভিত্তিক রাজনৈতিক দল বললেও প্রকৃত অর্থে জামায়াত পরিচালিত হতো মওদুদীবাদের ওপর ভিত্তি করে। আর অন্য কোনো বড় দলের ওপর নির্ভর করে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য জামায়াত সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ভাবে ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িক সংঘাতের হাতিয়ার।

মূলত সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে ফায়দা হাসিলের কৌশল গ্রহণ করায় উপমহাদেশে এখন পর্যন্ত চারবার নিষিদ্ধ ঘোষণা করে হয়েছে জামায়াতকে। ১৯৪১ সালের আগস্ট মাসে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বাংলাদেশে একবার, পাকিস্তানে দুবার ও ভারতে একবার জামায়াতকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। নিজ ঘরে, অর্থাৎ পাকিস্তানেই জামায়াতকে দুবার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় উসকানির অভিযোগে প্রথমবার পাকিস্তানে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা হয় ১৯৫৯ সালে। ১৯৬২ সালে আইয়ুব খান প্রণীত মুসলিম পরিবার আইনের বিরোধিতার কারণে ১৯৬৪ সালের ৪ জানুয়ারি জামায়াতে ইসলামীর কর্মকাণ্ড আবারো নিষিদ্ধ হয়। বর্তমানে দলটি পাকিস্তানে টিকে থাকলেও ক্ষমতায় যাওয়ার রাজনীতির ধারে কাছেও নেই। বরং বাংলাদেশের মতোই পরগাছা হয়ে আছে জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান। অন্য দলের সহায়তা ছাড়া এই দলটি কখনই ক্ষমতার স্বাদ গ্রহণ করেনি।

বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের বর্বরোচিত সব কার্যক্রম এখন প্রকাশিত। বিশেষত দেশের সূর্যসন্তানদের ধরে ধরে নিয়ে হত্যা করার পেছনে জামায়াতের কার্যক্রমের কথা সবার জানা। মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানের সৈন্যদের গণহত্যায় এবং মুক্তিযোদ্ধাদের আটক করে অত্যাচারের জন্য সবচাইতে বড় ভূমিকা রাখে জামায়াত। এ সময় ধর্ষণ, খুন, গুম, অগ্নিসংযোগ, অত্যাচার, লুণ্ঠন থেকে শুরু করে যুদ্ধাপরাধের সব কয়টি সংগঠিত করে জামায়াত। জাতিগত নিপীড়নের ক্ষেত্রে দেশের হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের খুঁজে বের করে তাদের সম্পদ দখল ও হত্যার কাজটি ৯ মাস ধরে চালায় তারা। মূলত এটি ছিল তাদের ধর্মভিত্তিক জাতিগত নিধনের একটি অংশ।

কিন্তু ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের সৈন্যদের সঙ্গে পরাজিত শক্তি হিসেবে জামায়াতকে শাস্তির আওতায় আনার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে ৯০ হাজার পাকিস্তানি সৈন্য আত্মসমর্পণ করলে জামায়াত কার্যত সেই সময়ই ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে তাদের বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শাস্তির ব্যবস্থা করেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বিদ্বেষ থেকে অসংখ্য সাধারণ মানুষ যেন হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে না জড়িয়ে পড়ে, এটাই ছিল বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে জামায়াতের নেতাকর্মীদের শাস্তির আওতায় আনার মূল কারণ। কেননা জাতি নিজেদের মধ্যে হত্যার সংস্কৃতি চালু করলে তা কারও জন্যই মঙ্গল ডেকে আনতে পারে না। বঙ্গবন্ধু এ সময় স্পষ্ট করে জানিয়েছিলেন কারা শাস্তির আওতায় আসবে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশে যেন জামায়াতের সাম্প্রদায়িক কার্যক্রম না চালাতে পারে অন্য কোনো নামে, সেই জন্য ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয় ১৯৭২ সালের সংবিধানে। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের চেতনা থেকেই ১৯৭২ সালে কার্যত জামায়াতের সাংগঠনিক কার্যক্রম শেষ হয়ে যায়।

কিন্তু ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পরিবারের অধিকাংশ সদস্যের সঙ্গে হত্যার মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুনরুত্থান ঘটে জামায়াতের। বিদেশি অর্থায়ন ও নিজেদের সাংগঠনিক কার্যক্রমের মাধ্যমে খুব দ্রুত দেশে ত্রাস সৃষ্টি করতে সক্ষম হয় দলটি।

১৯৭৬ সালের ৩ মে রাষ্ট্রপতি এএসএম সায়েম একটি অধ্যাদেশ জারি করেন। যেখানে বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৮ নম্বর অনুচ্ছেদ বাতিল করে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। ১৯৭২ সালের সংবিধানের এই ধারার কারণে জামায়াতের রাজনীতি অঘোষিতভাবেই নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশে। এ সময় সায়েম রাষ্ট্রপতি পদে থাকলেও ক্ষমতার মূল চাবি ছিল জিয়াউর রহমানের হাতে। এরপর জামায়াতে ইসলামীর আত্মপ্রকাশ করা ছিল শুধুই সময়ের ব্যাপার। কিন্তু জামায়াত তখনই নিজেদের দলীয় নাম ব্যবহার করে রাজনীতিতে আসেনি। কেননা তখনও সাধারণ মানুষের স্মৃতিতে বেশ স্পষ্ট ছিল মুক্তিযুদ্ধ সময়কালে জামায়াতের মানবতাবিরোধী কার্যক্রমের কথা। তাই কৌশলী হয়ে দলটি একই বছর ২৪ আগস্ট বেশ কয়েকটি ধর্মভিত্তিক দল মিলে ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ (আইডিএল) নামের একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গঠন করে। মুক্তিযুদ্ধের মাত্র ৬ বছরের মাথায় একটি দেশের স্বাধীনতার বিরোধীতাকারী দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর সদস্যরা এই প্রকাশ্য রাজনীতিতে ফিরে আসে! এই বছরই পাকিস্তানের পাসপোর্ট নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন গোলাম আযম।

ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগের ব্যানারে জামায়াতে ইসলামীর কয়েকজন নেতা ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে ছয়টি আসনে জয়লাভ করেন। যা ছিল মূলত জিয়াউর রহমানের হাতের মুঠোয় থাকা নির্বাচন। আরও স্পষ্ট করে বললে, জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিরোধী শক্তি জামায়াতের ৬ জন সদস্যকে জাতীয় সংসদে বসার ব্যবস্থা করে দেন।

১৯৮০ সালের মে মাসে ঢাকার ইডেন হোটেল প্রাঙ্গণে প্রথমবারের মতো জামায়াত রাজনৈতিক দল হিসেবে কনভেনশনের আয়োজন করে। যেখানে আব্বাস আলী খানের আহবানে প্রায় সাড়ে চারশ জন সদস্য যোগ দেন। এখানেই গোলাম আযমের একটি ভাষণ পড়ে শোনানো হয়। এই সম্মেলনে একটি নতুন গঠনতন্ত্র অনুমোদন করা হয়। যার ভিত্তিতে ১৯৭৯ সালের ২৭ মে চার দফা কর্মসূচি নিয়ে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশে কর্মতৎপরতা শুরু করেছিল। এরপর থেকে জামায়াতে ইসলামী দেশজুড়ে সভা সমাবেশ করা শুরু করে প্রকাশ্যে।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনেও বেশ তৎপর ছিল জামায়াতে ইসলামী। জেনারেল এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালে যে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় সেখানে জামায়াতে ইসলামী ১৮ আসনে জয়লাভ করে। জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন নিয়ে এ বছর সরকার গঠন করে বিএনপি। তখন থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে জামায়াতে। সেই সঙ্গে জিয়াউর রহমানের আমলে পাওয়া প্রচ্ছন্ন সহায়তা এ সময় থেকে সরাসরি সহযোগিতে পরিণত হয় যেখানে জামায়াত ও বিএনপি একে অপরের পরিপূরক হিসেবে আবির্ভূত হয়।

১৯৭৮ সালে দেশে ফেরার পর থেকে অধ্যাপক গোলাম আযম বারবার আমিরে জামায়াত নির্বাচিত হয়ে আসছিলেন। যদিও এটি সম্পূর্ণ অবৈধ ছিল বাংলাদেশে। কেননা তিনি পাকিস্তানের পাসপোর্ট নিয়ে দেশটির নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিলেন। এ বিষয়টি প্রথম প্রকাশ্যে জামায়াত ইসলাম ঘোষণা করে ১৯৯২-৯৪ সালে, যখন খালেদা জিয়ার সঙ্গে জোট বেঁধে সরকারে ছিল দলটি। ধারণা করা হয়, গোলাম আযমকে নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে সমঝোতা হয়ে গিয়েছিল বিএনপির সঙ্গে।

সে কারণেই এ ঘোষণা দেওয়া হয়। যদিও ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির মাধ্যমে শহীদ মাতা জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে তীব্র প্রতিবাদ গড়ে ওঠায় শেষ পর্যন্ত গ্রেফতার হয়েছিলেন জামায়াতের এই আমির। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন আমলেই সুপ্রিম কোর্ট থেকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পেয়ে ১৬ মাস কারাগারে থাকার পর বেরিয়ে আসেন গোলাম আযম। ২০০০ সাল পর্যন্ত জামায়াত ইসলামের আমির ছিলেন তিনি।

বাংলাদেশকে নিজ জন্মভূমি পাকিস্তানের থেকে পেছনের কাতারে দেখার বাসনা আজও ছাড়তে পারেনি জামায়াতে ইসলামী। আর এ কারণেই এখনও বাংলাদেশের উন্নয়ন থমকে দিতে বারবার সহিংসরূপে ফেরত আসে জামায়াত। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেন্দ্র করে আবারও জামায়াতকে নিজেদের সঙ্গে সহিংসরূপে দেখতে চায় বিএনপি। আর এই দেশের বুকে জামায়াতের থেকে ভয়ংকর ও ধ্বংসাত্মক শক্তি আর কী হতে পারে?

২০০১-০৬ সালে আরও একবার বিএনপির ঘাড়ে ভর করে ক্ষমতায় আসে জামায়াত। শুধু ক্ষমতায় আসা নয়, এ সময় জামায়াতের দুই নেতাকে মন্ত্রী বানিয়ে বাংলাদেশের পতাকা গাড়িতে তুলে দেন খালেদা জিয়া। সেই সঙ্গে তারেক রহমান ও জামায়াতের যোগসাজশে দেশজুড়ে চলে সাম্প্রদায়িক হামলা। সংখ্যালঘুদের জমি দখল, হত্যা, গুম, খুন, ধর্ষণ হয়ে পড়ে ‘খুব স্বাভাবিক’ ঘটনা। দেশজুড়ে অসংখ্য জঙ্গি গোষ্ঠী গড়ে তোলা হয় যারা সারাদেশে বোমা হামলা চালানোর পাশাপাশি আক্রমণ করতে থাকে প্রতিবেশী দেশ ভারতে।

ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা আশ্রয় পায় বাংলাদেশে। পরিবারসহ বাংলাদেশে বসবাস করে ভারতে নিশ্চিন্ত মনে হামলা চালায় তারা। আর তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী এবং জামায়াতের আমির নিজামীর নিয়ন্ত্রণাধীন চট্টগ্রাম পোর্ট ব্যবহার করে আনা ১০ ট্রাক অস্ত্র, যা ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী ও বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা জঙ্গিদের মধ্যে বণ্টনের জন্য নিয়ে আসা হয়েছিল, সেখানেও সরাসরি জড়িত ছিলেন তারেক রহমান ও জামায়াত নেতারা।

জামায়াতের সেই ভয়ঙ্কর রূপ এখনও তাড়া করে ফেরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়সহ দেশের অধিকাংশ মানুষকে। যে সময় প্রতিবাদী তরুণদের হাত-পায়ের রগ কেটে বিকলাঙ্গ করে রাখতো জামায়াত ইসলামীর ছাত্র সংগঠন শিবির। আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতাকর্মী ও মুক্তিযোদ্ধাকে এ সময় জবাই করে হত্যা করা হয়। মুক্তিযোদ্ধা ও সংখ্যালঘুদের ওপর জামায়াতের নিপীড়ন ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে খবর প্রকাশ করায় সাংবাদিকের মাথার ওপর ১০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে জঙ্গিরা প্রকাশ্যে!

জামায়াতের এই তাণ্ডবের অবসান ঘটে ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর। কিন্তু তখনও দলটি অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী এবং ২০০৮ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত অসংখ্য সাম্প্রদায়িক হামলা এই দলটির উদ্যোগে পরিচালিত হয়েছে। ২০০৮ সালে একেবারে শেষদিকে বাংলাদেশে যে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় সেখানে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। এরপর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য অভিযুক্তদের বিচার শুরু হয়। সে বিচারে গোলাম আযমসহ জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতৃত্বের অনেকেই দণ্ডিত হয়। এছাড়া দলটির অন্যতম শীর্ষ নেতা মতিউর রহমান নিজামী এবং আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, কামরুজ্জামান, কাদের মোল্লাসহ অনেকেরই মৃত্যুদণ্ড হয়। কিন্তু এরপরও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী ছিল জামায়াত। কিন্তু বর্তমান সরকারের উদ্যোগে দেশে আসা জঙ্গিবাদ সম্পর্কিত ফান্ড বন্ধ করা হলে ধীরে ধীরে জামায়াতের অর্থনৈতিক শক্তি খর্ব হতে থাকে।

জামায়াতে ইসলামী একটি মানবতাবিরোধী দল হিসেবে তার নিবন্ধন হারায়। গোলাম আযমের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকা প্রসঙ্গে দেওয়া আদালতের রায়ে বলা হয়, শুধু ১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী কার্যক্রমে জামায়াত ইসলাম জড়িত ছিল তা নয়। সাম্প্রতিক সময়েও তারা মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে। এ সময় উদাহরণ হিসেবে ২০০১ সালের পর জামায়াতের সাম্প্রদায়িক হামলা ও কার্যক্রমগুলোর কথা জানানো হয়।

জামায়াত বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের শুধু বিরোধিতা করেনি, দলটি পাকিস্তানের হানাদার বাহিনীর সহযোগীর ভূমিকা পালন করেছিল। এটা স্বীকৃত। অথচ মৌলবাদী এই দলটি তাদের সেই মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য আজ পর্যন্ত ক্ষমা চায়নি। অথচ জামায়াতের ছাত্র সংগঠন শিবিরের সভাপতি সম্প্রতি এক বক্তব্যে বলেছেন, ‘তাদের পূর্বসুরিরা অপরাধ করেতে পারেন। সেই দায় যাদের স্বাধীনতার পর জন্ম হয়েছে তাদের বহন করতে হবে কেন?’ কিন্তু এই যুক্তির কোনো যৌক্তিকত নেই। কারণ নতুন প্রজন্মের যারা জামায়াত বা শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত তারা তো সবাই জামায়াতের আদর্শ ও চেতনা বুকে ধারণ করছেন। কাজেই যুদ্ধাপরাধের দায় অস্বীকার করার উপায় নেই।

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জন্য দুর্ভাগ্য যে স্বাধীনতা লাভের মাত্র চার বছরের মাথায় তারা হারিয়েছে দেশটির স্বপ্নদ্রষ্টা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। তেমনিভাবে আমরাই একমাত্র দুর্ভাগা জাতি, যে জাতি যুদ্ধের ময়দানে যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, ৩০ লাখ শহীদের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছে, তাদেরই আবার স্বাধীনতা লাভের পর ক্ষমতায় দেখেছে। এটা দুর্ভাগ্যজনক ও দুঃখজনক। এমন নজির পৃথিবীর আর কোনো দেশ দেখেনি।

বাংলাদেশকে নিজ জন্মভূমি পাকিস্তানের থেকে পেছনের কাতারে দেখার বাসনা আজও ছাড়তে পারেনি জামায়াতে ইসলামী। এ কারণেই এখনও বাংলাদেশের উন্নয়নকে থমকে দিতে বারবার সহিংসরূপে ফেরত আসে জামায়াত। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আবারও জামায়াতকে নিজেদের সঙ্গে সহিংসরূপে দেখতে চায় বিএনপি। আর এই দেশের বুকে জামায়াতের থেকে ভয়ংকর ও ধ্বংসাত্মক শক্তি আর কী হতে পারে?

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

– কুড়িগ্রাম বার্তা নিউজ ডেস্ক –